বাক্‌ ১৫১ ।। অনুপম বলছি


 

কবিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শেষ অবধি কবিতার স্বপক্ষেই যায়। কবিতার মৃত্যু নেই, তার মৃত্যুই তার জন্ম। কিন্তু লিখতে এসে একজন কবিকে আগেই যেটা করতে হয়, প্রচলিত কবিতার সেই ধাঁচাটাকে ভাঙতে হয়, যেটা আসলে একটা গরাদহীন খাঁচা। বাল্মীকির সে চাপ ছিল না, তাঁর আগেকার কোনো ধারণা নিয়ে তাঁকে কাজ শুরু করতে হয়নি, শুধু ক্রৌঞ্চমিথুনই পর্যাপ্ত ছিল। কিন্তু এমনকি কালিদাসও সে সুবিধে পাননি। তাঁকেও প্রচলিতকে ভাঙতে হয়েছে- তাঁর আগে যা কিছু লেখালেখি হয়েছিল, কালিদাস তার ধ্বংসসাধন করেছিলেন, একমাত্র ভাস ছাড়া কেউ তাঁর মহাপ্লাবনের সামনে টিকতে পারেননি। কালিদাসকে কিন্তু আজও মুছে ফ্যালা গেল না। তিনি আছেন। মাইকেল তাঁর সময়ে এই একই কাজ করেছেন, রবিবাবু করেছেন। আজও রবিবাবু বহাল তবিয়তে আছেন। তাঁর পরে আর কোনো বন্যা আসেনি বাংলা কবিতায়। মাঝেমধ্যে ভারি বা হাল্কা জোয়ার এসেছে, আবার নিজের নিয়মেই ভাঁটা ফিরেছে। আমাদের সকল গান আজও তাঁকে লক্ষ্য করে। আমাদের কিছু থুতু আজও তাঁর আকাশটির দিকে নিক্ষিপ্ত হয়। তিনি আকাশ, তিনিই আকাশের ঈশ্বরভাবনা। তাঁকে দেবতা ভাবা চলবে না। তিনি শুধুই খেলার আনন্দ, আমাদের নিয়ে খেলার। তিনি তাই এসেছিলেন নেমে, আমাদের মধ্যে।

 এই মুহূর্তে লিখতে এসে যারা অন্য-অপর কবিতার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করতে চাইছেন, যারা বিদ্রোহী কবিতাতে আস্থা রাখছেন, এই মুহূর্তে তাঁদের জন্য একটা গাড্ডা কিন্তু তৈরি হয়ে গ্যাছে। ছন্দ আর অলঙ্কারকে অস্বীকার করে যা হওয়ার তা তো ৩০০% হয়ে গেছে। এবার ফেরার পালা। কবিতার ক্ল্যাসিক প্রতিমাকে অস্বীকার তখন করা গিয়েছিল যখন ব্রিটিশ সভ্যতা আর বাঙালি সংস্কৃতির সবটুকু কাজে লাগিয়ে একটা স্যাচুরেটেড জায়গায় বাংলা কবিতার শরীর পৌঁছে গিয়েছিল। সেই প্রতিমাকে না ভেঙে আর নতুন খোলামেলা মুক্তমেজাজের প্রতিমা হত না। ওটা ১৯৬০ থেকে ১৯৮০-র দশকের অবধি ঠিক ছিল, তখন কোনো কবি ছন্দে লিখলে তিনি প্রতিষ্ঠানের দাসত্ব ছাড়া আর কিছু করতেন না। প্রায় ৪ দশক কেটে গেছে ছন্দের কোনো পরোয়া না করে কবিতাচর্চার। যেটা মুক্তির দরজা ছিল, আজ দেখা যাচ্ছে সেটার চারদিকে কোনো দেওয়াল নেই, একটা ভগ্নস্তুপ, যেটা থেকে বেরোবার কোনো প্রয়োজন নেই আলাদা করে। ওটাকে এবার সরিয়ে ফ্যালাই ভাল। এখান থেকে কোনো ব্যক্তি যদি এই ধারণায় পৌঁছন যে অনুপম এবার অক্ষরবৃত্ত-মাত্রাবৃত্ত-স্বরবৃত্ত বা আনন্দবাজারী বৃত্তে কবিতা লেখার কথা বলছে, তিনি ভুল করবেন। আমি বলছি স্ব-ছন্দের কথা, যার মধ্যে কবির প্রতিদিনের বাক্যস্পন্দের স্পর্শ আমরা পাব। সেই সঙ্গে তাঁর স্বাভাবিক মাত্রাবিভাগ, পর্ব ও যতির বোধ, নিজস্ব শ্বাসাঘাত আমরা পাব। আঙুলের গাঁট গুনে গুনে কবিতা লেখার কথা বলা হচ্ছে না। অবিশ্যি প্রয়োজন অনুসারে যে কোন বৃত্তে তিনি প্রবেশ আর প্রস্থান করতেই পারেন। শুধু একটু বাঁকিয়ে অদ্ভুত কথা বলে দিয়েই কেউ যেন আর কবি তকমার আশা না করেন। ওটা অনেক হল। ‘আমি আজ ভাত খেয়ে অফিসে বসব’- এই বাক্যটি থেকে ‘আমি আজ চাঁপা খেয়ে বাগানে বসব’ লেখার কেরামতি এবার অসহ্য হয়ে পড়ছে।

সত্যিই আজ কবিতার ক্ল্যাসিক অবয়বটিকে ভাঙার হদ্দ হয়ে পচাগলা অবস্থায় পৌঁছেছে। এবার কিন্তু দ্রোহীদের আবার শাশ্বতর দিকে ফিরে যাওয়ার পালা। এই অশিক্ষিত পরিসরে কবিতার কোনো মহিমাই নাহলে আর বাকি থাকবে না। আজ কোবিরা চাইছেন ৫ মিনিটের খ্যাতি। আজকের কোবিতা আগামীকাল মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছে। কোথাও সিগনেচারের কোনো মূল্য নেই। এঁরা অস্ত্রশিক্ষা নেওয়ার আগেই বুড়ো আঙুল গচ্ছিত রেখেছেন মাস্টারমশাইদের কাছে- সো কলড সফল কবিরা সেই মাস্টারমশাই। যেহেতু কবিতা লেখা মানেই উচ্চারণের বাঁক ও ব্যঞ্জনা- অনেকেই আজ শিখে নিয়েছে একটু কায়দা করে বাঁকিয়ে কথা কীভাবে বলতে হয়, ছাপার মতো কোবিতা কীকরে লিখতে হয়। এখানে অন্ত্যমিলের কথা বলছি না অবশ্যই। কবি তাঁর পাঠককে অন্ত্যমিলের বাজনা শোনাবেন কিনা, সেটা তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার। অন্ত্যমিলের কোনো ক্ল্যাসিক তাৎপর্য আমি স্বীকার করি না। আমি মনে করি না ৮+৬ মাত্রার হিসেব শুধু যিনি মেলাতে পারেন, অথবা ৭+৫-এর, তাঁকে কবি ভাবার কোনো কারন আছে। শুধু বলছি, ছন্দবোধ যার নেই, যিনি বাক্যের স্পন্দন তাঁর লেখায় জাগাতে পারেন না, জাগালেও তাতে লেগে থাকে হাটবাজার আর অভ্যাসের ছাপ, আর বাক্যের ধর্ম এবং ধর্মহীনতা যিনি জানেন না, তাঁকে শুধু অদ্ভুত আর আঁকাবাঁকা কিছু লালিত্যপূর্ণ কথা বলার জন্য কবির মর্যাদা দেওয়া যায় না। তিনি যে কবি হতে বদ্ধপরিকর, কবিতাকে যে যিনি সমাজে মই হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন, সেজন্যই শুধু তাঁর চমকপ্রদ উচ্চারণ কাউকে কবি হিসেবে আস্থাভাজন করবে না। না, এতক্ষণ আপনি ছাপার ভুল পড়ছিলেন না। এঁদের আমি সসম্মানে ‘কোবি’ বলে থাকি, এঁরা সেটা মুখের উপরে শুনেও zআনতি পারেন না। কবি আর কোবি, প্রায় একইরকম শুনতে লাগে বন্ধু। 

বাক্‌ ১৫১ ।। মৌসুমী ঘোষ


 

নিলাম

 

(এক)

 

সকালে পৃথা কাকিমা ফোন করেছিল কর্ণকে। পৃথা, কর্ণের ছোটোকাকিমা। ছোটোকাকু মারা যাবার পর ছেলে অর্জুনকে নিয়ে নিউটাউনে ফ্ল্যাট কিনে শিফট্ করেছে। একটা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করে কাকিমা।

ফোন করেই কাকিমা জানতে চাইল, তোমার শরীর ঠিক আছে তো কর্ণ?

কর্ণ, ‘হুঁ’, বলতেই কাঁদো কাঁদো গলায় বলতে শুরু করল, কিন্তু তোমার ভাই অর্জুন ভালো নেই কর্ণ।

—সেকি, কী হয়েছে অর্জুনের? কোথায় আছে, বাড়িতে না হসপিটালে?

—হসপিটালে। রক্তের প্রয়োজন। ‘ও’ পজিটিভ। তাই তো তোমাকে ফোন করলাম, কর্ণ। শিগগির তুমি অ্যাপোলোতে চলে এসো। শহরের কোনো ব্লাড ব্যাঙ্কে রক্ত নেই। এখনই রক্ত লাগবে বলে ফোন এসেছিল হসপিটাল থেকে।

—কিন্তু কাকিমা, আমিও তো সবে রোভিড থেকে সেরে উঠলাম। এখন তো আমি রক্ত দিতে পারব না। ডাক্তারের মানা আছে।

ফোনটা কেটে দিল পৃথাকাকিমা। তবে মেসেজে লিখল, রক্তটা পেলে চুঁচুড়ার বাড়ির ওয়ারিশন আমি ছেড়ে দেব কর্ণ, প্লিজ।

কর্ণ মনে মনে ভাবল তার শরীরের এক বোতল রক্তের মূল্য এই পৈত্রিক সম্পত্তির অর্ধেকটা! বাড়িটা কিছু না হোক একশো বছরের পুরোনো। দাদুর বাবার আমলের। এদিকটায় সব বাড়িই ওই সময়ের। বেনেপাড়া। পাশাপাশি সবাই লতায়-পাতায় আত্মীয় হলেও কেউ কারোর বিশেষ খবর নেয় না। এখন তো আরো-ই নয়। পরিস্থিতি যা হয়েছে এই বাড়ি ছেড়ে কর্ণকেও না মাকে নিয়ে চলে যেতে হয়। গা লাগোয়া বাড়িগুলোয় প্রবেশ করতে হয় সরু একফালি গলি দিয়ে। গলি এত সরু যে একটামাত্র সাইকেল বা বাইক ঢোকে কোনোমতে। বাড়িটাও বারেবারে ভাগ হতে হতে এতই ছোটো হয়ে এসেছে যে উঠোন বলতে তুলসিমঞ্চ আর বাসন মাজার কল।

 

(দুই)

 

কর্ণ তখন অফিসে। ফোন এল সুপ্রিয়ার। সুপ্রিয়া কর্ণের পুরোনো প্রেমিকা। দেখা করতে চাইল নন্দন চত্বরে। কর্ণ একবাক্যে রাজি হয়ে গেল। কর্ণ এখনও ভালোবাসে সুপ্রিয়াকে। যদিও সুপ্রিয়া এখন অন্য পুরুষের ঘরনী। অফিস থেকে বেরিয়ে নন্দন চত্বরে যেতে যেতে দেখল ধূধূ করছে চারিদিক।

রোভিড রোগটা আসার পর থেকেই রাস্তাঘাটে লোকজন বেরোনো ভয়ানক ভাবে কমে গেছে। কোভিডের ভয় কেটে গেলেও, ঘরে ঘরে রোভিড আসামাত্রই মানুষ আবার প্যানিকগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। হবে নাই বা কেন। রোভিড হয়নি এমন মানুষ ভূ-ভারতে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া অনেকেরই বাড়াবাড়ি হচ্ছে, তখন রক্তের প্রয়োজন হচ্ছে। নিজের গ্রুপের রক্তের মানুষদের একটা তালিকা সরকার থেকে বানাতে বলা হয়েছে সবাইকে। এই কাজটা ফেসবুকে খুব দ্রুত সেরে ফেলেছে নতুন জেনারেশন। ‘রক্ত-বন্ধু’ তালিকার মানুষরা আজকাল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ বানাচ্ছে। গুগুল মিটে আড্ডা দিচ্ছে।

—কীরে কতক্ষণ? সুপ্রিয়া আগের মতোই পিছন থেকে এসে চমকে দিল কর্ণকে। আর একটু হলেই কর্ণের হাত থেকে সিগারেটটা পড়ে যেত। খুব সামলে নিয়েছে।

—বেশিক্ষণ না। চ, হলদিরামে বসে তোর ফেভারিট জুস খেতে খেতে গল্প হবে। সিগারেটের ফিল্টারটা মাটিতে ফেলে বুট দিয়ে ঘষে দিল কর্ণ।

—না রে আজ হবে না। খুব কম সময়ের জন্য এসেছি। ভীষণ দরকার, তাই—

—কী দরকার? রক্ত?

—হ্যাঁরে। তুই কীকরে বুঝলি?

—আমার রক্ত ‘ও’ পজিটিভ। ‘হু’ ঘোষণা করেছে, একমাত্র ‘ও’ পজিটিভ গ্রুপের রক্ত সার্বিক দাতা, সবাইকে দিতে পারবে। তারজন্যই বহু পুরোনো চেনাপরিচিতরা মাঝেমাঝেই ফোন করছে, বাড়ি আসছে…

—শোন না, আমার ছেলের বয়স আট। ওকে শিশুমঙ্গল হসপিটালে ভর্তি করেছি কাল। সকালে হসপিটাল থেকে রক্তের ব্যবস্থা করতে বলেছে। ওর গ্রুপ ‘ও’। ওর গ্রুপের কেউ রক্ত দিতে রাজি হল না। তুই তো গ্রুপে নেই, কিন্তু তোর রক্তের গ্রুপ আমি জানতাম, তাই… প্লিজ আমার ছেলেটাকে বাঁচা, কর্ণ।

—আমিও তো সবে সেরে উঠলাম, এখন ছয়মাস রক্ত দেওয়া বারণ ডাক্তারের।

—সেরে উঠেই স্মোক করছিস? সরি, সেটা তোর ব্যক্তিগত ব্যাপার। শোন, চাইলে তোর সঙ্গে আউটিং-এ যেতেও রাজি আছি। আগে ছেলেটা সুস্থ হোক। প্লিজ, ভেবে দেখ কর্ণ। তুই তো সেবার প্রস্তাব দিয়েছিলিস, মন্দারমণি যেতে। সেবার যাইনি, প্রমিস, এবার যাব। আমার ছেলেটাকে রক্ত দিয়ে বাঁচা, কর্ণ।

—আমার একটা কাজ আছে, আজ আসছি। বলেই হনহন করে হেঁটে নন্দন চত্বর থেকে বেরিয়ে এল কর্ণ। ফাঁকা বাসে উঠে শিয়ালদার টিকিট কাটল। বাসের জানলার ধারে বসে ভাবছিল, সুপ্রিয়ার সঙ্গে প্রেমের দিনগুলোর কথা। মফস্‌সলের সরকারি কলেজ। গঙ্গার ধারের পার্ক। সিনেমাহল…

 

(তিন)

 

প্রায় একমাস হতে চলল। মাঝেমাঝেই পড়শির কারোর, বন্ধুদের, পরিবারের কারোর কিংবা অফিসের কারোর রক্তের প্রয়োজন লেগেই রইল। কিন্তু কর্ণ সকলকেই একই কথা জানাল, তাকে ডাক্তার বলেছে অন্তত ছয়মাস রক্ত না দিতে। ব্যাপারটা এই পর্যন্ত ঠিকই ছিল। এরমধ্যে প্রত্যেককে ‘না’ বলে বলে কর্ণ প্রায় সকল আত্মীয়-বন্ধু বিচ্ছেদ ঘটিয়ে একলা-জীবন কাটাতে লাগল। এমনকি কর্ণের চাকরিটাও গেল, অফিস বসের শালির জন্য রক্ত দিতে সম্মত না হওয়ায়।

হঠাৎ একদিন কর্ণের মায়ের জ্বর এল। মায়েরও রোভিড ধরা পড়ল। মাকে চুঁচুড়া ইমামবাড়া হসপিটালে ভর্তি করা হল। পরের দিনই মাকে রেফার করা হল কলকাতায়। সেখানে ভর্তি করা মাত্রই হসপিটাল জানাল মাকে রক্ত দিতে হবে। মায়ের রক্তের গ্রুপ ‘বি’ পজিটিভ। মায়ের রক্তের গ্রুপে রক্ত চেয়ে ফেসবুকে একটা পোস্ট দিল কর্ণ। সঙ্গে সঙ্গে এক সহৃদয় ব্যক্তি রেসপন্স করল। পোস্টে অবশ্য অনেকে মন্তব্য করল, কর্ণ তাদের চেনা অনেককে রক্ত দেয়নি। কিন্তু সেই সহৃদয় ব্যক্তি সেসব কথায় কর্ণপাত করল না। তবে মেসেঞ্জারে কর্ণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইল। সেদিন দুপুরেই ওরা ক্যালকাটা হসপিটালের সামনে সাক্ষাৎ করল।

সাক্ষাতের প্রথমেই কর্ণ জেনে নিল, সহৃদয় ব্যক্তিটির নাম সহদেব। কোনো ভনিতা না করে সহদেব জানাল, যদি কর্ণ তার একটি কিডনি দিতে পারে তবেই সে কর্ণের মাকে রক্ত দেবে।

—আপনি টাকা চান আমি দেব কিন্তু কিডনি কীকরে দেব?

—টাকা নয়। আমার মায়ের জন্য ‘ও’ পজিটিভ গ্রুপের রক্তের কারো একজনের একটি কিডনি চাই।

ব্যাপারটা অদ্ভুতভাবে জটিল হতে লাগল। দু’জনের হাতেই সময় খুব অল্প। হসপিটাল কর্ণের মায়ের রক্তের জন্য বারবার ফোনে তাড়া দিচ্ছে, এদিকে রোভিড রোগটাতে সবচেয়ে ইমপরট্যান্ট অঙ্গ— কিডনি। ডাক্তাররা টিভিতে ফেসবুকে সতর্ক করছে, যাতে সকলে কিডনির সুরক্ষা করে। পরিশোধিত জল খায়। রং মেশানো খাবার না খায়। রক্ত পরিশোধিত করতে কিডনির গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ সেই কিডনি দিতে হবে কর্ণকে! নিজের মাকে বাঁচাতে! সহদেবের মাকেও বাঁচাতে।

         ভাবার জন্য কর্ণ কিছুটা সময় চাইল সহদেবের কাছে। এই সময়টাতে কর্ণ ব্যস্ত শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাবল নিজের বাবার কথা। বাবা সারাজীবন পাতি একটা প্রাইমারি স্কুলে চাকরি করে, টিউশনি করে, সংসারের জন্য উদয়াস্ত খেটে, পঁয়ষট্টি বছর বয়সে সুগার ফল করে মারা যান। মার বয়স সত্তর। চোখ বোজা মাত্রই কর্ণ মায়ের আকুতিভরা মুখ দেখতে পেল। চোখ খোলা মাত্রই দেখল সহদেবের মায়ের আকুতিভরা মুখ, সামনে দাঁড়ানো সহদেবের চোখে যেন খনিকের জন্য ভেসে উঠল। দুই মায়ের মুখের হাসির মূল্যে তার কিডনি বিকোতে হবে— এটা ভেবে খুব একটা খারাপ লাগছিল না কর্ণের। তৎক্ষণাৎ নিজের বয়সের কথা ভেবে আবার অন্য দুশ্চিন্তায় পড়ল। এখনও বিয়ে করেনি। বাবা মারা যাওয়ার পর মায়ের অর্ধেক পেনশনে আর নিজের বেসরকারি চাকরির আয়ে মা-ছেলের মোটামুটি চলে যাচ্ছিল। নেহাত পৈত্রিক বাড়িটা ছিল তাই। নাহলে এই বাজারে বাড়ি ভাড়া দিয়ে থাকতে হাড় হিম হয়ে যেত।

দুশিন্তার কি আর শেষ আছে? দু’দিন আগেই পৃথাকাকিমা পৈত্রিক বাড়িটার অংশ বিক্রির জন্য উকিলের নোটিশ পাঠিয়েছেন। এখন অর্জুন সেরে উঠে হসপিটাল থেকে বাড়ি ফিরেছে। হসপিটালে অনেক টাকার বিল পেমেন্ট করতে হয়েছে কাকিমাকে। তাই তিনি খুব শীঘ্র চুঁচুড়া বাড়ির অংশটা বেচে দিতে চান।

এবার মনে মনে বাড়িটা বাঁচাতে যে টাকা লাগবে সেটা কর্ণ হিসেব করতে লাগল। অ্যাকাউন্টেনসির ছাত্র কর্ণ। তাই হিসেবটা মুখে মুখে করেও নিল। তারপর পুরো ব্যাপারটা লাভ-ক্ষতির এক্সেল শিটে ফেলে দেখল, শুধুমাত্র এক বোতল রক্তের বিনিময়ে একটা গোটা অঙ্গ। তাও আবার কিডনি— দেওয়া যায় নাকি! অনেক ভেবে চিন্তে তাই এক বোতল রক্তের সঙ্গে সাত অঙ্কের টাকার একটা অ্যামাউন্ট জানিয়ে দিল সহদেবকে।

টাকার অঙ্ক শুনে সহদেব বলল, আপনার মায়ের রক্ত এখনই চাই, কিন্তু আমার মায়ের জন্য যে কিডনিটা চাই তার জন্য ডাক্তার কিছুটা সময় দিয়েছেন, ভেবে দেখুন। ঠিক আছে কিছু টাকা নাহয় আমি দেব। তবে অত নয়। সহদেব পাঁচ অঙ্কের টাকার অ্যামাউন্টটা বলা মাত্রই আবার কর্ণ হিসেব করতে শুরু করল। হিসেব করে দেখল, সহদেব যা দেবে বলল, তা দিয়ে কোর্ট ঘর করে পৃথাকাকিমার কাছ থেকে বাড়িটা কিনে নেওয়া অসম্ভব। তাই টাকার অ্যামাউন্টটা বাড়াতে দর কষাকষি শুরু করল কর্ণ।

অনেক কথার পৃষ্টে কথার পর সহদেব বলল, আমি ভেবে দেখতেই পারি। কিন্তু আপনার হাতেই সময় কম। আপনার মায়ের রক্ত এখনই লাগবে। তাই আমি যা দিচ্ছি তাতেই সন্তুষ্ট হওয়া ছাড়া আপনার উপায় নেই।

সময়ের কথা শুনেও হার মানল না কর্ণ। শেষে ঠিক হল, দু’জনেই দু’জনের প্রস্তাব নিয়ে এক রাত ভাববে, যে অন্যের প্রস্তাবে সম্মত হবে সে ফোন করে জানাবে।

 

(চার)

 

নিশ্চিন্তে ভাববার জন্য ট্রেন ধরে সন্ধের আগেই চুঁচুড়ায় ফিরে এল কর্ণ। গভীর ভাবনা। ভাবতে ভাবতে রাত ঘনিয়ে এল। জানলার কাছে যেতেই দেখল চারিদিকের বাড়িগুলোতে এলইডি লাইট জ্বালিয়েছে। আজ শ্যামাপূজা। ছোটোবেলায় এই কালীপুজোর সময়গুলো কর্ণরা দেশের বাড়ি যেত। কালীপুজোর পরদিন গ্রামের বিখ্যাত কালীমন্দিরের সামনে পুজোয় পাওয়া শাড়ি, ফল, মিষ্টি, সিঁদুর, আলতা, ধূপ, বলির পাঁঠা, সব নিলাম হত। বাবা, মায়ের জন্য দশ-বারো টাকা দিয়ে ঘরে পরার লালপাড় সাদা শাড়ি নিয়ে আসত, কর্ণের জন্য চার আনার চিনি সন্দেশ, বাড়ির সকলের জন্য বলির পাঁঠার মুড়ি। পেঁয়াজ, রসুন ছাড়া সেই মুড়ির ঝোলের স্বাদ কেমন ছিল আজ আর মনে নেই কর্ণের কিন্তু নিলামের কথা স্পষ্ট মনে আছে।

         সেদিন সারা রাত ধরে কর্ণ সেই নিলামের ডাক শুনতে পেল। আর ভোররাতে ফোনটা এল…

কার ফোন এত সকালে! হসপিটাল থেকে নয়তো!

বাক্‌ ১৫১ ।। জয়শ্রী গাঙ্গুলি

 

দামু

 

দামু, ও দামু, খড়গুলো তুলে রেখে জায়গাটা পরিষ্কার করে রাখ, গোঁসাইবাড়ির বড়োকত্তা হেঁকে বলেন। দামু, বারান্দাটার কোনায় জড়ো করে রাখা, খড়ের স্তূপ ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করে গোরুগুলোকে খুঁটি থেকে খুলে ছেড়ে দেয়। বড়ো শীত পড়েছে এবার। বিবর্ণ চাদরটা গায়ে জড়ায় দামু। একটু রোদে বসলে ভালো হত। কাল রাতে বড়ো ঠাণ্ডা লেগেছে। হাত, পা যেন অসাড় হয়ে গেছে। পঞ্চাশ বছর বয়স হলে কি হবে, জোয়ান লোকেদের মতো শক্তি ধরে দামু। তাদের গাঁয়ের আর পাঁচটা সাঁওতাল জোয়ানের চেয়ে তার গায়ের শক্তি কম না।

ওই, আবার ডাক পাড়ে বড়বাবু, কোথায় গেলি রে দামু? গোরু-মোষগুলোর মুখে একটু জল ধর।

আবার বড়োগিন্নী ডাকেন অন্দর থেকে, ও দামু, উঠোনটা একটু পরিষ্কার করে দে দিকি বাবা।

সারাদিন এই ফাইফরমাশ চলতেই থাকে। তারপর ক্ষেতে যেতে হয় লাঙল নিয়ে। এখন ধান তোলার সময়। আরও পাঁচটা মুনিষ খাটে, তবু দামুই ভরসা। মারাংবুরু দামুকে শক্তিও দিয়েছে। কালো, খোদাই করা, পেটানো চেহারা— কষ্টিপাথর যেন। দীর্ঘ চেহারা, গায়েও সেরকম শক্তি। একালে, ভীম বেঁচে থাকলে হয়তো দামুর মতোই দেখতে হত। ঘরে ঝুমরি আর ছেলেমেয়ে দুটো— ওদের কথা বড়ো মনে হয়। ফসল মাড়াই না হলে, যাওয়া তো যাবে না ঘর।

গোঁসাইকত্তাদের এত বড়ো দালানবাড়িটার গোয়ালের কোনার বারান্দাটায় জায়গা হয় তার। খড়-বিচালি পাতে, চট পাতে, তার উপর একখান ছেঁড়া চাদরে মুড়িসুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে, এই দীর্ঘ শীতের রাত। বেলা দশটা বাজলে, মালকিন জলখাবার দেয়। মুড়ি আর একখান কাঁচালংকা। সাথে একখান মুলোও দেয়। তারপর গোরুগুলোকে নিয়ে চলে যায় মাঠে। ধান তোলার সময় এখন। কত্তারা মাঠে বসেই তদারকি করে। বেলা পড়ে আসে। সাঁঝের মুখে ক্ষেত থেকে ফিরে সেজোমালকিনের কাছে সরষের তেল চেয়ে গায়ে মাখে দামু। তারপর পুকুরে একটা ডুব মেরে ভাত খাওয়ার ফুরসৎ পায়। একথালা ভাত বেড়াল ডিঙোতে পারে না। দামু খেতে বসে। সামান্য ডাল আর তরকারি। সেজোমালকিনের বড় মায়া— একটা মোটা চাদর দিয়েছে দামুকে গায়ে দেওয়ার জন্য। এই চাদরের ওমটুকু তার বিলাসিতা। শুকনো কাঠকুটোয় আগুন জ্বালিয়ে অসাড় হাত-পা টানটান করে। গোয়ালঘরের কাছের এই বারান্দাটুকুতে রাতে বড় হাওয়া ঢোকে হুহু করে। ভাত খেয়ে একটা শালপাতার চুট্টা ধরায় সে। গোরু-মোষগুলোই তার আপন মনে হয়। রাতের বেলায় ঝুমরির মুখটা মনে পড়ে। ছেলেপিলে দুটোকে নিয়ে শীতের রাতে কি করচে কে জানে। আগুনটুকু নিবু নিবু হয়ে আসলে ঘুম লাগায় দামু। সারাদিনের খাটাখাটনির শরীরে ঘুমের পাহাড় নেমে আসে। স্বপ্ন দেখার আর ফুরসৎ কই। আরও পাঁচটা মুনিষ কাজ করে তার সাথে গোঁসাইবাড়িতে। সবই আশেপাশের গাঁয়ের তাদের। এ বাড়িতে অনেক লোক। সকাল হলে সে গোরুর জাব নিয়ে গোয়ালঘরে ঢোকে। বড়োকত্তার নাতি আর নাতনি ছুটে আসে, ও দামুকাকা, আমাদের বলটা নালার দিকে গড়িয়ে গেছে, তুলে দাও দিকি। একহাঁটু কাদার মধ্যে বল গেছে ঢুকে। তাও সে কাদা মাড়িয়ে তুলে আনে বল। দামু গোল গোল চোখে দেখেছে, দাদাবাবুদের ছেলেরা লম্বা লাঠি আর বল নিয়ে কি একটা খেলছিল। আরও তিনটে লাঠি পোঁতা। এ তো তাদের ছোটবেলার ডাংগুলি খেলার মতো অনেকটা। তাকে বারবার ডাকছিল বলটা কুড়িয়ে আনার জন্যে। বেশ মজার খেলা। আহা ছেলেপুলে দুটোর কথা মনে হয়। গাঁয়ে গাঁয়ে পাখির পেছনে আর কুলজঙ্গলে খড়ি ওঠা গায়ে ঘুরে বেড়ায়। এ খোকা আর খুকিটা ঠিক তার বুধন আর হাঁসির বয়সের। চোখে জল আসে ওদের দেখে। এ বছরের পরবে ওদের জন্যে বল একটা কিনে নিয়ে যেতে হবে আর ঝুমরির কাচের চুড়ি। বড়ো ভালো পিঠে বানায় ঝুমরি। আসন্ন পরবের আনন্দে চোখ চিকচিক করে দামুর।

কী হল, ও দামুকাকু, বলটা ধুয়ে আনো।

খোকাটার আওয়াজে বাস্তবে ফেরে সে।

গোরুগুলোকে খামারের রোদে বেঁধে রাখে। আজ ধান তুলতে হবে। ছোটোগিন্নি এসে খাবার দেয় দামুকে। সেই ছোটোবেলায় বাবা মরে যায়। তারপর থেকে লোকের বাড়ি কাজ করেই অর্ধেক জীবন পার হয়ে গেল তার। গোঁসাইদের এই এত বড়ো তিনতলা বাড়িটা। উঠোন, খামার, চার ভাইয়ের জমজমাট সংসার। কতলোক ঘরে। চাষবাস আর মস্ত বড়ো ভূষিমালের দোকান।

বড়োকত্তার তিন ছেলে আর চারটে মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। মেজোকত্তারও দুই ছেলে দুই মেয়ে। আর সেজোকত্তার তিন মেয়ে। ছোটোকত্তার তিন ছেলে। দিদিমণিরা যখন আসে ঘরে হইচই লেগে যায়। দামুর খাটনি পড়ে খুব। কিন্তু ভালোটা-মন্দটা জোটে। মিষ্টি তো আগে দেখেনি কখনও। এদের বাড়িতে দিদিরা এলে খেতে পায়। এ বাড়ির সেজোগিন্নির গরিব-দুখির দিকে বড়ো মায়া। দামুর জন্যে মিষ্টি রেখে দেয়। বাটি করে জলখাবারের মুড়ির সঙ্গে দেয়। বলে, ও দামু, খা। বড়ো ভালো লাগে দামুর এটুকু স্নেহ।

দামুর জায়গা তো গোয়ালঘরে ওই গোরু-মোষগুলোর পাশে। মানুষের চেয়ে ওই গোরু-মোষগুলোকে বেশি চেনে সে। অবলা জীব কেমন করে তাকিয়ে থাকে। খড়ের গাদায় চাদর পেতে শুয়ে কত কথা মনে পড়ে তার। সেই হাঁসুলির কথা। সে তো চলে গেল দু-দিনের জ্বরে।

তারপর ঘরে ঝুমরি এল। কেমন আছে কে জানে বউটা। বুকের ভেতরটা কেমন চিনচিন করে। কাল আবার সকাল সকাল উঠোন ঘরদোর সব পরিষ্কার করতে হবে। গোরুগুলোকে ক’দিন বাইরের খামারে বেঁধে রাখতে হবে। মেজোকত্তার মেয়ের বিয়ে যে। দামুর জায়গা তখন বাইরে খামারের কোনার বারান্দাটায়। গোরুগুলোর সাথে। এক এক করে কুটুমজন আসতে থাকে। আর দামু ওদের বাক্স, সুটকেস বয়ে বয়ে আনে। চোখ বড়ো বড়ো করে দেখে কত রঙিন রঙিন কাপড়জামা পরা দিদিদের ছেলেমেয়েদের। দাদাবাবুরাও বাইরে থেকে অনেকে আসে।

আহা, ছেলেপুলেদুটোর কথা মনে করে তার চোখে জল আসে। এই শীতের রাতে দুটো পাতলা চাদর গায়ে জড়িয়ে থাকে। কে জানে শরীর কেমন আছে তাদের। এবার মনিব পয়সা দিলে, দু’খান মোটা জামা কিনে নিয়ে যাবে সে। আর ঝুমরির একখান ফুলকাটা শাড়ি। হঠাৎ খেয়াল হয়, বাছুর দুটোকে তো ছাড়া হয়নি। দুধ দোয়ার সময় বেঁধে রাখা হয়েছিল।

বাছুর দুটোকে ছেড়ে দেয় মায়ের কাছে। লোকজন, হইচই লেগে গেছে ঘরে। সন্ধের মুখে থালায় ভাত নিয়ে বারান্দার কোনাটায় খেতে বসে দামু। কত বড়ো চাঁদোয়া টাঙানো হয়েছে উঠোনে। বিশাল উঠোন, ওখানেই বিয়ের আসর বসবে। খামারের এক কোনায় বড়ো বড়ো উনুন করে মিষ্টির ভিয়ান হচ্ছে। আর চারদিন মোটে। অবাক বিস্ময়ে বড়ো বড়ো চোখ করে দামু দেখে। অনেক রাতে, সেজোমালকিন বাটি করে দুটো মিষ্টি দিয়ে যায়, এ দামু খা।

কৃতজ্ঞতায় মন নুয়ে আসে। গরিব-দুখির উপর তোমার এত কেন দয়া মালকিন?

ছ’ দিন কেটে গেছে। বিয়েবাড়ি চুকেছে। সবকিছু যেন ঘোরের মতো লাগে। মেজোকত্তার মেয়ে বেলিদিদিকে বিয়ের সময় কী সুন্দর লাগছিল! কত আতসবাজি, আলো। চোখ তার ধাঁধিয়ে গেছে। অনেক খাটাখাটনি গেছে। সন্ধের পর আজ কেমন জ্বর জ্বর লাগছে। গায়ে-হাতে-পায়ে বড়ো ব্যথা। রাতে এল ধূমজ্বর। সকালে ধূম জ্বর গায়ে সে শুয়ে থাকে। উঠতে আর পারে না। বড়োকত্তা শুধোন, এই তোর কী হয়েছে রে? দামু নড়ে না। গোয়ালের কোনাটায় চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে। দুপুরে সেজোমালকিন এসে দু’টি মুড়ি আর একটা ওষুধ দিয়ে যায় তাকে। ঘোর চোখে তাকায় দামু। ওষুধটা খেয়ে জ্বরটা একটু কমে। দু’দিন শুয়েই থাকে। কেমন একটা নেশা নেশা অন্ধকারের মধ্যে ঝুমরির মুখটা যেন দেখতে পায়। ছেলেপুলে দুটোর মুখ মনে ভাসে।

আজ তিনদিন হল, দামুটা গোয়ালঘরটার কোনায় পড়ে আছে। গোঁসাইবাড়ির সেজোমালকিন একটা ছোটো বাটিতে জল আর একটা কাপড়ের ফেট্টি নিয়ে আসে, ও দামু এইটা একটু লাগা দেকিনি। আর এই ওষুধটা খা। আলগোছে সেজোমালকিন দেয়। সকালে জ্বরটা একটু কমে। আজ অনেকদিন বাদে চোখ খুলে তাকাল সে। কিন্তু বড্ড দুর্বল। মাথা তুলতে পারে না। বেলায় এসে সেজোমালকিন দুটো গরম ভাত দিয়ে যায়। বলে, খা দামু, সেরে যাবি। সামনে এসে বাটিটা নামায়। বাটিটা তুলতে গিয়ে দু’ ফোঁটা চোখের জল মালকিনের পায়ের ওপর পড়ে।

কাঁদিস না রে, ভালো হয়ে যাবি। বাঁচতে তো তোকে হবেই। ঘরে ছেলেপিলে আছে, মালকিন বলে।

বিধাতা অলক্ষ্যে হাসেন। এ কিসের সম্পর্ক! সম্পূর্ণ বিজাতীয় পুরুষ দামু। এ তো স্নেহের সম্পর্ক নয়, না তো এ প্রেমজ সম্পর্ক, বা অপত্য সম্পর্ক। এর একটাই নাম মানবতা। সেখানে না আছে স্বামী-স্ত্রীর সীমারেখা, না আছে ভাই-বোন বা মাতা-পুত্রের বাঁধন। কোনও স্বার্থ নেই, না আছে কোনো চাওয়া, পাওয়া। এটুকুর টানেই সূর্য আলো দেয়। বিনা স্বার্থে বাতাস বয়। ধনী-দরিদ্র, পাপী-পুণ্যবান সকলের জন্য। প্রসাদবারি আকাশ থেকে পড়ে ঝরে। ভোরের আলো ফোটে। পাখিরা গান গায়।

আস্তে আস্তে দামুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। খুব শিগগিরি সেরে উঠবে সে। ঝুমরি আর ছেলেমেয়ে দুটোর হাসি হাসি মুখ তার দিকে চেয়ে থাকে। আস্তে আস্তে চোখ খোলে দামু। বাঁচতে তাকে হবেই। শুধু বেঁচে থাকার জন্যে। শীর্ণ হাতদুটো তুলে গড় করে সেজোমালকিনকে। গোয়ালের গোরুটা হাম্বা রবে ডেকে ওঠে বাছুরটার দিকে তাকিয়ে।


বাক্‌ ১৫১ ।। সাদী মোহাম্মদ


 

আমাদের একটিই চুমুর স্মৃতি

 

লসএ্যাঞ্জেলস শহর। আমেরিকার বাংলা টাউন। বাঙালিদের বসবাসের জন্য খ্যাত। রাহাত এখানে একটি আইটি কোম্পানিতে জব  করছে প্রায় পাঁচ বছর। বিয়ে করেনি এখনও। দেশে ফেরার কোনো তাড়াহুড়ো নেই। বাবা-মা বেঁচে নেই। একজন বড় বোন রয়েছে। যিনি ইডেন থেকে মাস্টার্স শেষ করেছেন ইকোনমিক্সে। বিয়ে করে সংসার করছেন। ঢাকায় স্থায়ী বসবাস। আর্থিক সচ্ছলতা থাকলেও একটা বাচ্চাদের স্কুলে শিক্ষকতা করেন সময় কাটানো ও ব্যস্ত থাকার জন্য। বাবা-মায়ের অবর্তমানে অভিভাবক হিসেবে একমাত্র ভাইকে বিয়ে করে সংসারী হতে বলেন প্রায়ই।

বাবা-মা মারা যাবার পর যশোরের বেজপাড়া এলাকায় রাহাতদের তিন বিঘের বাড়িটা পতিত পড়ে ছিল দীর্ঘদিন। বেজপাড়ায় শেখ হাসিনা সফটওয়্যার পার্ক নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ হলে বাড়িটি সরকারের কাজে লাগে। বিনিময়ে যা টাকা পায় তার কিছু অংশ দিয়ে আমেরিকা যায় রাহাত। এরপর আর নতুন করে বাড়িঘর নির্মাণ করে স্থায়ী আবাসন তৈরি করেনি রাহাত। ফলে স্থায়ী ঠিকানাবিহীন হয়ে আর দেশে আসা হয়নি রাহাতের।

এরপর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। বোনের পীড়াপীড়িতে এবার দেশে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাহাত। দেশে মেয়ে দেখা হচ্ছে। রাহাতের এতে কোনো আগ্রহ নেই। বোনের পছন্দের পাত্রী বিয়ে করবে। নিজস্ব কোনো পছন্দ-অপছন্দ নেই। দেশে ফেরা বা বিয়ে উপলক্ষ্যে অগ্রিম ছুটি নেওয়ার জন্য অফিসে দরখাস্ত করেছে রাহাত। তিনমাসের ছুটি পাবে মার্চের মাঝামাঝি থেকে।

রাহাতের জন্মস্থান ও বেড়ে ওঠা যশোরে। শৈশবস্মৃতির শহর যশোরে স্থায়ী আবাসন হিসেবে বাড়ি করবার ইচ্ছে রয়েছে। ক্যান্টনমেন্ট এলাকা পছন্দ রাহাতের। বিয়ের পাত্রী পছন্দ করতে যশোরের মেয়েকে প্রাধান্য দিতে বলে রেখেছে রাহাত ওর আপুকে। আপু নীতু নামের একটি মেয়েকে ভাইয়ের বউ হিসেবে পছন্দও করেছেন। সাদামাটা একটা মেয়ে। ফর্সা-কালোর মাঝে মোটাসোটা একটা শরীর। মাঝারি-লম্বা গড়ন  নীতুর। ক্যান্টনমেন্ট কলেজের পদার্থের লেকচারার। বয়স ২৯ বছর ৬ মাস ২৭ দিন জন্মসনদ অনুযায়ী। রাহাতের লম্বা গড়নের চিকন শরীরের ৯ মার্কা চেহারার তুলনায় মেয়েটির শারীরিক সামর্থ্য, সৌন্দর্য ভালো অবশ্যই।

দুই পরিবারের পছন্দ মিলে যাওয়ায় আংটি পরানো হয়েছে। রাহাত দেশে আসলে বাকি ফর্মালিটিজ মেইন্টেইন করা হবে। মেইলে রাহাতকে ছবি পাঠানো হল নীতুর। ছবি দেখে রাহাত থ! বিস্ময়ে ওর চোখ বড় হয়ে মণিগুলো কুঠুরি হতে ঠিকরে বের হবার উপক্রম হলো। মনে পড়ে গেল ছাত্রজীবনের কিছু সুন্দর স্মৃতি।

এম. এম. কলেজ, যশোর। ২০০৮ সালের কথা। অনার্সে ভর্তি হতে আসল নীতু। রাহাত তখন সেকেন্ড ইয়ারে। ছবি ও সার্টিফিকেট সত্যায়িত করা হয়নি নীতুর। ভর্তির লাস্ট ডেট। নীতুর কী করা উচিত, কিভাবে কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। সাথে পরিবারের কেউ নেই। সেইদিন নীতুর কাগজপত্রে সত্যায়িত সিল মেরে নিজেই স্বাক্ষর করে কলেজের অফিসে জমা দিয়ে দেয় রাহাত। বেশিরভাগ সত্যায়িত যে এভাবেই ভুয়া হয়ে থাকে তা নীতুর বিশ্বাসই হচ্ছিল না। রাহাত তখন বিএনসিসির সদস্য। নীতুকেও সদস্য হবার অনুরোধ জানায় প্রথম পরিচয়ে।

ক্লাস  শুরু হলে মাঝেমধ্যে হাই-হ্যালো, দেখা-কথা হত। এরপর বিএনসিসি ও বিবর্তন সংগঠনের মাধ্যমে কবিতা নিয়ে আড্ডা এবং রক্তদান কর্মসূচিসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় বন্ধুত্ব গাঢ় রূপ নেয় রাহাত-নীতুর। নীতু বা রাহাত কেউ ভালো আবৃত্তি করে না। ভালোলাগা থেকে কবিতাচর্চা করে। ক্যাম্পাসের বাইরেও নিজেদের প্রয়োজন-অপ্রয়োজন শেয়ার করে বিশ্বস্ততায়।

অনার্সের শেষদিকে রাহাতের বোনের বিয়ে হয়। কিছুদিন পর রাহাতের মা-বাবা রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান। এসময় রাহাত খুব একা হয়ে পড়লে নীতু মানসিক সাপোর্ট দেয়, সময় দেয়, সঙ্গ দেয়। অন্য সাবজেক্টের স্টুডেন্ট হয়েও বেশ কষ্ট করে রাহাতের ফাইনাল পরীক্ষার যাবতীয় নোট সংগ্রহ করে সাজিয়ে গুছিয়ে দেয় নীতু। এভাবে চলার কারণে নীতুর উপর ডিপেন্ডেন্ট হয়ে পড়ে রাহাত। তীব্র ভালোবাসা তৈরি হয়। বন্ধুর চেয়ে আরও আপন ও বিশেষ কেউ মনে হয় নীতুকে। কিন্তু নীতুর দিক থেকে কখনও বন্ধুত্বের বেশি কোনো ইঙ্গিত পায়নি রাহাত। তাই বন্ধুত্ব নষ্ট হবার ভয়ে রাহাত আগ বাড়িয়ে মুখে কিছু বলত না। তবে মেয়েদের সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত ঐশ্বরিক ক্ষমতা রয়েছে। সেই ক্ষমতাবলে নীতু যে সব বুঝেও সাড়া দিত না, এটা ভেবেই রাহাত নেগেটিভ রেজাল্ট ধরে নিয়েছিল। নিশ্চয় নীতু তাকে পছন্দ করে না। সরাসরি এ নিয়ে কখনও আলাপ হয়নি ওদের। বিপরীত লিঙ্গের বন্ধুত্ব খুব দুর্লভ, যা শুধুই বন্ধুত্বে সীমাবদ্ধ।

মাস্টার্সে যশোর ছেড়ে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয় রাহাত। সাবসিডিয়ারি আইসিটিতে পড়বার সুযোগ পায়। আইসিটি নামমাত্র! ক্লাস গজামার্কা আর শিখেছেও অষ্টকলা। তবু একটা অতিরিক্ত সার্টিফিকেট পায় এই যা। অবশ্য এ কোর্সের কারণেই নিজস্ব প্রচেষ্টায় আইটিতে দক্ষ হয়ে ওঠে রাহাত। আর সেটাই রুটিরুজির বাহক হয়ে যায় কিছুদিন পর। মানুষ যা হতে চায় তা আসলে নিরানব্বই ভাগ মানুষই ভুলে যায়। আর-একজনের চাওয়া বা প্রয়োজন মেটাতেই হয়তো একসময় বেঁচে থাকা অর্থবহ হয়ে ওঠে।

মাস্টার্স চলাকালীন ও বাড়ি বিক্রির সময়ে কয়েকবার দেখা হয় ওদের। আমেরিকা যাওয়ার পর থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় প্রযুক্তির এ সময়েও। রাহাত আসলে প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবার আগেই নিজেকে গুটিয়ে নেয়। নীতু শুধু হ্যাঁতে হ্যাঁ মিলিয়ে যোগাযোগের চেষ্টাটা করেনি। হয়তো রাহাতের আগ্রহের ভাটার কারণেও সেটা হতে পারে।

লসএ্যাঞ্জেলস যাওয়ার সুযোগ পেয়ে রাহাতের জন্য শারীরিক দূরত্ব বাড়ানোটা আরও সহজ হয়। ভালোবাসার মানুষ বুকের বামপাশে হার্টবিটের মতো বসবাস করে। তাকে চাইলেই কেউ সরিয়ে রাখতে পারবে না। প্রেমিকেরা সে চেষ্টা করে না। তবে শারীরিক দূরত্ব বাড়িয়ে তারা মানসিক প্রশান্তি খোঁজে।

রাহাতের ভালোলাগা, ভালোবাসার নির্মোহ এই বিচ্ছিন্নতার প্রচেষ্টা দীর্ঘ পাঁচ বছর সফল ছিল। কিন্তু নীতুর ছবি দেখবার পর সব এলোমেলো হয়ে যায়। কথা বলতে ইচ্ছে করে। ভীষণ রকম টান অনুভব করে। কিন্তু দীর্ঘ বছরের দূরত্বে কথা না বলার রেওয়াজ ভেঙে প্রাথমিক শুরুটা করতে কোথায় যেন বাধা পায়, আটকে যায়। দমে যায় কথা বলার অদম্য স্পৃহা। দীর্ঘ বিরতিতে কথা বলবার সবথেকে প্রিয় মানুষটির সাথে কথা না বলাই যৌক্তিক হয়ে ওঠে। অথচ কথা জমে জমে পাহাড়সম হয়ে আছে। ঠিক যেন কোনটা দিয়ে শুরু করা যায় সেটাই বাছাই করতে না পারা। কিন্তু একবার শুরু হলে হয়তো দীর্ঘ রাতদিন বুকে জড়িয়ে সব না বলা কথা নির্বাক বলে দেওয়া যাবে। কিন্তু রাহাত বলতে পারে না, শুরুটাও হয়ে ওঠে না। আর নীতুর মধ্যে কী হচ্ছিল রাহাত তা জানে না। বুঝতে চেষ্টা করলে নেগেটিভ এসে ভিড় করে বলে ভাবতে চায় না।

বিয়ের কথা পাকা হয়েছে, নীতুকে আংটি পরানো হয়েছে। কিন্তু নীতু কি এ বিয়েতে রাহাতকে জেনে বা ছবি দেখে মত দিয়েছে? নাকি পরিবারের চাওয়াতে মত দিয়েছে? ওর নিজের কি কেউ পছন্দের নেই? রাহাতের মনে নানান চিন্তা এসে ভিড় করে। অফিস ছুটির চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা করে রাহাত। বিয়ের আগে অন্তত নীতুর সাথে সরাসরি দেখা করতে চায়, কথা বলতে চায়। সব প্রশ্নের মীমাংসা চায় কিন্তু সেটা ফেসবুক, হোয়াটস‌আ্যপ বা ফোনে কথা বলে নয়। রাহাত সরাসরি দেখা করতে চায় প্রিয় নীতুর সাথে।

মার্চের ১৪ তারিখ থেকে ছুটি পাশ হয় রাহাতের। তিনমাসের ছুটি। এরমধ্যে বিয়েসহ যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে হবে। এখনও একমাস বাকি ছুটি শুরু হতে। অথচ এখনই একটা আনন্দের হিল্লোল বয়ে যাচ্ছে রাহাতের মনে। আবার প্রশ্নবাণে জর্জরিত হচ্ছে সংশয়ের দোলাচলে।

বিভিন্ন প্রশ্ন ও সংশয়ের মধ্যে কেটে গেল কিছুদিন। শুরু হল একবিংশ শতাব্দীর ভয়াবহ বছর। মহামারীতে রূপ নিল করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব। স্তিমিত হয়ে পড়ল সারা বিশ্ব। লকডাউন নামে ঘরে বন্দি হলো চীন, ইতালিসহ আক্রান্ত দেশের মানুষ। এই দুঃসময় মাথায় নিয়ে দেশে ফিরল রাহাত। বোনের বাসায় উঠল। উত্তরা নয় নম্বর সেক্টর। স্নিগ্ধা ভিলার চার নম্বর ফ্লোরের ফ্ল্যাটে। ১৪ মার্চ থেকে ১৪ দিন থাকবে হোম কোয়ারেন্টাইনে। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বুড়ো আঙুল দেখিয়েছিল, কিচ্ছু হবে না! কিন্তু করোনা ট্রাম্প চেনে না! তাই সতর্ক থাকা। বোনের পরিবারকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা।

৮ মার্চে বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হয়েছে। এর পুরোভাগ ক্রেডিট বিদেশ ফেরত মানুষের। বিমান বন্দরে পরীক্ষার যন্ত্র থাকলেও সেই যন্ত্র চালাবার চালক নেই কিংবা যন্ত্রের কার্যকারিতা নেই! আবার ৫০০ টাকায় করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেটও পাওয়া যায় এখানে! হোম কোয়ারেন্টাইন শেষ হলে যশোর যাবার সিদ্ধান্ত নেয় রাহাত। যদিও নীতুর অ্যাড্রেস জানে না রাহাত তবে আপুর থেকে জেনে নেওয়া যাবে। তাছাড়া ক্যান্টনমেন্ট কলেজ তো চেনেই। পদার্থ বিজ্ঞানের লেকচারারকে খুঁজে পেতে খুব একটা অসুবিধা হবে না।

কোয়ারেন্টাইনের দিনগুলো খুব বোরিং কাটে রাহাতের। আপু এটা-ওটা রান্না করে রুমের দরজার পাশে রাখে। রাহাত দরজা খুলে খাবার রুমে নিয়ে প্রয়োজনমতো খায়, ফ্রিজিং করে। খাবার পর বালিসে মাথা রেখে আয়েশি ভঙ্গিতে ঝিমোয়। প্রথম দেখায় নীতুকে কী কী বলবে সেসব ভেবে ভেবে ঠিক করে। কিছুক্ষণ পরে সেগুলে বাদ দিয়ে নতুন করে ভাবে। কিছুই গুছিয়ে উঠতে পারে না। এভাবে আরও কয়েকদিন কেটে যায়।

প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন, স্কুল-কলেজের পর বিশ্ববিদ্যালয়ও বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বিরোধী দলের নেতার মুক্তি, দীর্ঘ সাজাভোগ করা কয়েদিদের মুক্তিসহ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের উৎসব এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান না করার সিদ্ধান্ত নেয় রাষ্ট্র। লোকসমাগম নিষিদ্ধ করাসহ সার্বিক বিবেচনায় সমগ্র দেশ লকডাউনে যেতে বাধ্য হয়। ২৫ মার্চ থেকে সমগ্র দেশের সাথে ঢাকা শহরের সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। রেল, সড়ক, নৌচলাচল বিচ্ছিন্ন করা হয় অনির্দিষ্টকালের জন্য।

সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয় যেন কোভিড-১৯ ভাইরাসটি ছড়াতে না পারে মাসপিপলের মধ্যে। পুলিশকে সর্বোচ্চটা দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখা গেল। পুলিশ যে জনগণের বন্ধু সেটা প্রমাণিত হল এই দুর্যোগের শুরুর দিকে। কিন্তু সাধারণের মধ্যে লকডাউনের, আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইনের মতো কঠিন পরিভাষাগুলোর গুরুত্ব বোঝানো গেল না। তারা চোর-পুলিশ খেলায় নামল মনে হয়। গলির মোড়ের দোকান থেকে বাজারের ভিড় কমল না। সাধারণের বোধহয় কারফিউ বা ১৪৪ ধারার ব্যাপারেই শুধু জানাশোনা! সত্য যে, বাঙালি একমাত্র লাঠির ভাষা সহজে বোঝে— আবারও তারা বীরদর্পে প্রমাণ করল।

ভাবনায় ডুবে, খবরের কাগজ পড়ে আর টকশো শুনে দিন কাটছিল রাহাতের। বিশেষ বিশেষ টিভির টকশো দেখলে কমেডি, হাতাহাতি, ঝগড়াসহ থ্রিলার সাসপেন্সের মতো ফিল একসাথে পাওয়া যায়। আর সঞ্চালকের জ্ঞানগর্ভ অবিচক্ষণতার কথা নাই বা বলা যাক। এই অভিজ্ঞতা রাহাতের দেশে এসে নতুন ভাবে হল। এসব বিষয় থেকে মনকে ডাইভার্ট করতে জানালায় দাঁড়ায় রাহাত। বাইরে তাকালে চোখে পড়ে মানুষের হেঁটে চলা। মুখোশ পরা মানুষ! রিকশা ভর্তি বাজারের বহর নিয়ে বাসার দিকে যাচ্ছে অনেকেই। অথচ এভাবে চললে কৃত্রিম সংকট তৈরি হবে, দাম বাড়বে স্বাভাবিকভাবেই। অবশ্য বাজার তদারকি হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে। যেন কেউ দাম বেশি রাখতে না পারে। তবু পাঁচ টাকার মাস্ক পঞ্চাশ হল। হ্যান্ড স্যানিটাইজার চল্লিশ টাকারটা দুশো টাকায়ও বিক্রি হল কোথাও।

এই যে দুর্যোগ শুরু হল, রাহাত ভাবল এই তো কেটে যাবে। এই তো সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু লকডাউনের মেয়াদ বেড়েই চলল। একইভাবে আক্রান্তের সংখ্যাও। রাহাতের যশোর যাওয়ার অপেক্ষাও বাড়ল। অপেক্ষার সময় এমনিতেই দীর্ঘ হয়। আর সেটা যদি বসে-শুয়ে নিতান্ত অলস কাটাতে হয়, তাহলে তা আরও দীর্ঘ হবে ভাবা বাহুল্য। সরকারি অফিস, বেসরকারি অফিস, গারমেন্টসসহ অন্য অফিস-আদালত বন্ধ রয়েছে। উৎপাদন বন্ধ হলেও খাবারের চাহিদা তো আটকে রাখা যায় না। ক্ষুধা কোনো ধর্ম মানে না। তার চায় নিবারণের উৎস। জনবহুল দেশের লোকদের কর্মহীন রাখা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। জনসংখ্যা সহজেই দ্বিগুণ হবার সম্ভাবনাও থাকে! চীন, ইতালি ও আমেরিকাতে করোনা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিন কয়েক হাজার করে মানুষ ভাইরাসের কারণে মারা যাচ্ছে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশই আক্রান্ত হয়েছে ভাইরাসটির বিস্তারে। বাতাসের মাধ্যমে রোগটি মহামারি ছাড়িয়ে অতিমারিতে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এর সহজ ও দ্রুত কোনো নিরাময় নেই। এটাও ভাবাচ্ছে সবাইকে। রোগটি বিস্তারের কারণ অনুসন্ধানে কোনো সোর্স খুঁজে পাচ্ছে না বিজ্ঞানীরা। কোনো প্রতিষেধক নেই। সহজে আবিষ্কারের সম্ভাবনাও দেখাচ্ছে না কেউ। প্রতিদিন অসংখ্যবার হাত ধুয়ে ধুয়ে হাতের উপরের চামড়া পাতলা হয়ে যাচ্ছে মানুষের।

লকডাউনের মধ্যেই পহেলা বৈশাখ পার হয়ে গেল। পহেলা বৈশাখে রমনা পার্ক কিংবা দেশের অন্য কোথাও কোনো অনুষ্ঠান হল না। ঘরে বসে বৈশাখী সাজের আবহে সাজানো মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণটা দেখা ও শোনা গেল মাত্র। দীর্ঘদিন দেশে রাষ্ট্রপতির কোনো বাণী নেই। স্বাভাবিক স্বভাবসুলভ রসিকতা নেই। সদানন্দের এই মানুষটাও বোধহয় বিরস হয়ে পড়েছেন। ভাবছে রাহাত। ভাবা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই রাহাতের।

গরিবদের মধ্যে এখন আর নিয়মের তোয়াক্কা করতে দেখা যাচ্ছে না। পেটে খেলে পিঠে সয়। এখন তো পেটই খালি। ত্রাণের চাল-ডাল তাদের পর্যন্ত সব পৌঁছাচ্ছে না। ইতোমধ্যে স্থানীয় নির্বাচিত কয়েকজন চালচোর প্রতিনিধিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। আর্মি মাঠ পর্যায়ে জণগনকে সচেতন করছে। বেশিরভাগ ডাক্তার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। যদিও তাঁরা করোনার সর্বোচ্চ  প্রোটেকশান নিয়ে কাজ করছেন বলা যায় না। ডাক্তার, নার্স— এর মধ্যে অনেকেই করোনা আক্রান্ত হয়েছেন।

২৫ এপ্রিল রমজান মাস শুরু হল। প্রতিবার রাহাত কয়েকটি রোজা রাখে। এবার ঘরে বসে নামাজ ও রোজার প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়েছে। সবগুলো রোজা রাখবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভয় মানুষের মধ্যে ধর্মীয়বোধ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। দশজনের বেশি মসজিদে সালাত আদায় করতে পারবে না— সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অথচ লক্ষাধিক মানুষ জানাজায় অংশ নিয়ে বিপদের মধ্যে পড়ার বোকামি করেছে দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী জেলায়। ধর্মীয় কুসংস্কার আফিমের মতো। আসক্ত হয়ে গেলে আফিমই শান্ত রাখে বিধায় রাষ্ট্র তাল মিলিয়ে চলতে চেষ্টা করে বোধহয়! কয়েকটি রোজা হয়ে গেল। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বিশ্বাস ভুল প্রমাণ করে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেল। মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকল।

এরই মধ্যে ১৫ মে আসি আসি করছে। নীতুর জন্মদিন। রাহাত সিদ্ধান্ত নিল নীতুকে সারপ্রাইজ দিয়ে দেখা করবে ১৫ মে। দেশে এসে ঢাকায় অবস্থান করেও রাহাত কোনো যোগাযোগ করেনি নীতুর সাথে। সারপ্রাইজ দিবে বলে অপেক্ষা করে আছে শহরের ছোট্ট ফ্ল্যাটে। জীবন রসহীন, বিস্বাদ হয়ে উঠেছে। বদ্ধ ঘরে বিষাদ ছড়িয়ে যাচ্ছে চাঁদের মতো একাকী অথচ স্বপ্নময় সময় কাটিয়েও। এভাবে আর কতদিন কাটাতে হবে কেউ জানে না। প্রকৃতি বিরূপ হয়ে উঠেছে। নিজেকে সারমেয় করে তুলেছে। প্রকৃতিও সারভাইব করতে চেষ্টা করছে নিজস্ব চেষ্টায়। সম্ভাবনাময়ী পৃথিবী অকালপ্রয়াত হতে চায় না।

পরিস্থিতি বিরূপ হলেও রাহাত সিদ্ধান্ত নেয় ১৫ মে সশরীরে হাজির হবে নীতুর সামনে। ভালোবাসি বলবে। বিয়েতে নীতুর সম্মতি আছে কী-না জানতে চাইবে। নীতু নামের প্রতি যে অদ্ভুত টান রয়েছে রাহাতের তা নীতুর অজানা নয়। সে টান এখনও একইভাবে রয়েছে। না পাওয়া বিষয়ের প্রতি মানুষের আকর্ষণ অদম্য। সহজে যা পাওয়া যায় তার গুরুত্ব কেউ স্বীকার করে না। তার মূল্যায়ন সবাই করতে পারে না।

১৪ মে রাত এগারোটার দিকে প্রাইভেট কার চালিয়ে যশোরের উদ্দ্যেশ্যে রওনা হলো রাহাত। নিজের আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে। দুলাভাই গাড়ির কাগজপত্র ঠিকঠাক রেখেছেন। তাই বিশেষ সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে বলে মনে হয় না রাহাতের। তাছাড়া পদ্মা নদীতে ফেরি পার হতে বিশেষ কোনো অসুবিধা নেই। সময়ে মানুষের কাছে ঘোর বিপদও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। সময়ই সর্বোত্তম প্রতিষেধক দিয়ে থাকে। করোনাকালীন এ সময়ে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, গড়ে কুড়িজনের বেশি মারা যাচ্ছে। সামনে হয়তো প্রতিদিন বিশ হাজার আক্রান্ত হবে, একহাজার জন মারা যাবে। তবু প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে, ব্যাংক, বাজার, গারমেন্টস খোলা আছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য বাইরে যেতে হচ্ছে। হাসপাতালে হার্টের রোগী ভর্তি হয়ে করোনা পজিটিভ হয়ে বাসায় ফিরে যাচ্ছে! তবু সাধারণ মানুষ মৃত্যু উপেক্ষা করে বাইরে আনন্দচিত্তে মৃত্যুমিছিল করছে, কেউ করতে বাধ্য হচ্ছে।

রাহাত ফেরিঘাটে পৌঁছল রাত দেড়টার সময়। বৈরী আবহাওয়ার কারণে রাতে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় পদ্মা-যমুনার গোয়ালন্দ পার হতে পারল না। সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল। সকাল সাতটার পর ফেরি চলাচল শুরু হলে ঘাট পার হল রাহাত। নয়টায় দিকে মাগুরা সৈকত হোটেলের সামনে গাড়ি থামিয়ে রাতের সমস্ত ক্লান্তি থেকে সতেজ হতে হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা করল। আজ আর রোজা রাখেনি রাহাত। শরীরটা দুর্বল হয়ে পড়েছে নির্ঘুম রাত কাটানোর জন্য।

সাড়ে দশটার সময় যশোর শহরে ঢোকার আগে চেকপোস্টে থামতে হল রাহাতকে। ঢাকা বা বাইরের যে কোনো জেলা থেকে লোক আসলে তাদের তাপমাত্রা পরীক্ষা করে শহরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। বিধি বাম! রাহাত অনুমতি পেল না। শরীরের তাপমাত্রা বেশি। রাহাতকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে করোনা টেস্টের জন্য যেতে হল। টেস্ট করার পর একটি আইসোলেশন সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হল। পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পেতে একদিন সময় লাগবে। সেই পর্যন্ত এখানে থাকতে হবে। গাড়ির মধ্যে ত্রিশটি টকটকে লাল গোলাপের সুবাস শুকিয়ে ম্রিয়মাণ হচ্ছে। নীতুর সাথে দেখা করার অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে। এক শহরে থেকেও কিছু করার উপায় নেই। আনন্দ-মুহূর্তের জন্য অপেক্ষার সময় দীর্ঘ হয় পৃথিবীতে। পাওয়ার জন্য যে ভ্রমণ তা সহজ হয় না কখনোই। সবাই শুধু অর্জনটুকু দেখে, সে অর্জনের জন্য যে ভ্রমণ, তার খবর কেউ কোনোদিন নিতে আসে না।

পরেরদিন দুপুরের পর রিপোর্ট আসল। রাহাতের করোনা নেগেটিভ। ছাড়া পেল আইসোলেশন সেন্টার থেকে। গাড়ি নিয়ে ছুটে গেল ক্যান্টনমেন্ট কলেজে। কলেজ বন্ধ। একজন পিয়নকে পেল। তার মাধ্যমে ফিজিক্সের একজন ম্যাডামের নম্বর পেল। এই ম্যাডামের মাধ্যমে নীতুর খোঁজ পেল রাহাত। পাওয়া গেল বাসার ঠিকানা। রাহাত চাইলেই আপুর থেকে নম্বর বা ঠিকানা নিতে পারত। সহজ বিষয়টিকে একটু কঠিন করে পেতে চলল রাহাত।

নীতুর নম্বর পেলেও ফোন দিল না। সোজা বাসার ঠিকানায় চলে গেল। চাররুমের ফ্ল্যাট আকারে তৈরি বাংলো টাইপের দুইতলা ভবন। বাড়িটা বেশিদিন আগের তৈরি নয়। তিন-চার বছর হবে হয়তো। গেটের সামনে একটি লিচু গাছে পাকা থোকা থোকা লিচু ঝুলছে। নীতুর বাবা সরকারি চাকরি থেকে রিটায়ার করার পর জমি কিনে ছোট্ট এ বাড়িটি তৈরি করেছেন। দুইতলায় থাকে নীতুরা। কলিংবেল চাপবার সময় বুকটা দুরুদুরু করে কাঁপছে রাহাতের। ঘেমে যাচ্ছে অদ্ভুত আবেগে। ভুলে ফুলগুলোও গাড়ীতে ফেলে রেখে এসেছে। তৃতীয়বার কলিংবেল বাজানোর পর নীতুই দরজা খুলল। সাদা রংয়ের টিশার্ট পড়া, মাথার চুলগুলো কিশোরীদের মতো দুটো বেণী করা। রাহাতকে দেখে দরজায় ঠায় দাঁড়িয়ে রইল নীতু। কারও মুখে কোনো কথা নেই। নেই কোনো বাক্যবিনিময়, আনুষ্ঠানিকতা কিংবা আবেগে চিৎকার করে ওঠা। ভাষাহীন দুটি প্রাণ কতক্ষণ এভাবে কাটিয়েছে কেউ অনুমান করতে পারেনি। হয়তো তিন মিনিট, পাঁচ মিনিট বা আরও অধিক সময়। নীতু একসময় দরজা ছেড়ে ঘুরে দাঁড়ালে রাহাত ফ্ল্যাটের ভেতরে এগিয়ে গেল। নীতুর রুম। হালকা নীল রঙের দেয়াল। ড্রেসিং টেবিল, শোকেসে নীতুর কিছু পুরস্কার সাজানো। দেয়ালে রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও আহমদ ছফার ছবি। বিছানায় মাথার পাশের দেয়ালে রাহাত। মানে রাহাতের অনার্সে পড়ার সময় নীতুর সাথে তোলা একটা সাদাকালো ছবি। একটু বড় করে ফ্রেমে সাজিয়ে টাঙানো। তার পাশে বিএনসিসি থেকে পাওয়া রাহাতের একটি সম্মাননা সার্টিফিকেট নেওয়ার ছবি। একটু অবাক হয় রাহাত এ বাড়িতে তার অবাধ যাতায়াত ও পরিচিতি আছে জেনে। এ পর্যন্ত কেউ কারও সাথে কথা বলেনি। বসতে বলবার কথাও ভুলে গেছে নীতু।

নীতুর বাবা-মা ছেলের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। নীতুর বিয়ে উপলক্ষেই এ বেড়ানো। কিন্তু করোনার  কারণে ফিরে আসা হয়নি তাঁদের। কাজের মেয়েটি আপাতত আসে না। নীতু একাই বাড়িতে।
রাহাতের সামনে দীর্ঘসময় বসে থাকার কারণে কিছুটা স্বাভাবিক হল। পিরিয়ড চলছে বলে নীতু ৬ দিন রোজা করছে না। নীতুর ধর্মীয় রীতিপালনে উদাসীনতা ছিল। কিন্তু ইদানীং ও নামাজ, রোজার মতো ম্যান্ডেটরি ধর্মীয় রীতিপালনে অভ্যস্ত হয়েছে। রাহাতও রোজা নেই জেনে ফ্রেশ হতে বাথরুমটা দেখিয়ে দিয়ে খাবারের টেবিল গোছালো। যা রান্না করেছিল তাই দু’জন ভাগ করে খেল। অনার্সে পড়াকালীন এমন অনেকবার খেয়েছে। রাহাতের জন্য প্রায়ই নীতু রান্না করে নিয়ে যেত। রাহাত একা খেতে চাইত না। তখন নীতুকেও একটু ভাগ নিতে হত। রাহাত গাড়ি থেকে গোলাপ ও হাতে তৈরি একটি জন্মদিনের কার্ড এনে নীতুকে দিল। কোনো প্রশ্ন করা হল না, কোনো কিছুই জানতে চাওয়া হল না। না বলা কথা হয়তো নীরবতার ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে। তাই রাহাতের আর ওসব জানবার প্রতি আগ্রহ রইল না।

নীতুর থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকায় ফেরার সময় হল রাহাতের। শেষ সময়ে নীতু আর নিজেকে আড়াল করতে পারল না। জড়িয়ে ধরল রাহাতকে। ঠোঁটে এক দীর্ঘ চুম্বনে নিজের ভালোবাসার জানান দিল সামাজিক দূরত্বের কথা ভুলে। বুকের পরম উষ্ণতা ও চোখের জল মিলে একাকার হয়ে তৈরি হল আনন্দ-অশ্রু। দীর্ঘ অপেক্ষা ও তীব্র আকাঙ্ক্ষার জমা বরফে এ চুম্বন উষ্ণতা ছড়াল প্রগাঢ় ভালোবাসায়।

রাহাত ঢাকা পৌঁছালো রাত দশটার দিকে। বাসায় ফিরে দীর্ঘ গোসল দিয়ে ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে খেয়ে একটা দীর্ঘ ঘুমের কাছে নিজেকে সমর্পণ করল। ঘুম থেকে উঠল পরেরদিন সকাল দশটায়। বিছানায় শুয়ে নীতুকে ফোন দিল। দীর্ঘ দিনের জমানো বরফ গলে কথার রাজবল্লম ছুটে চলল মোবাইলের এপাশ থেকে ওপাশে কান পেতে থাকা মায়াহরিণীর দিকে। এভাবেই কেটে গেল আনন্দের আতিশয্যে আরও কয়েকটি দিন। পাঁচদিন পর হালকা জ্বর হল রাহাতের। এর দু’দিন পর শরীর ও গলা ব্যথা। জ্বরের তাপমাত্রা ১০১ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেল। সেদিন রাতে বমি শুরু হলে বুঝতে বাকি রইলো না যে এটা করোনারই লক্ষণ।
১৬২৬৩ নম্বরে কল করে কথাও বললো রাহাত। অষ্টম দিনের মাথায় ঢাকা মেডিকেলে করোনা পরীক্ষা করাতে যায় নিজেই গাড়ি চালিয়ে। পরিবারের অন্যদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলছিল এ ক’দিন। টেস্ট করানোর পরদিন সরকারি অ্যাম্বুলেন্স এসে হাসপাতালে নিয়ে যায় রাহাতকে। রাহাত দুর্বল হয়ে পড়েনি, তাই বাসায় থেকে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারত। কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যদের কথা ও এলাকার মানুষের কথা চিন্তা করে হাসপাতালে যাওয়া সমীচীন মনে করল।

আঠারো দিনের মাথায় সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরল রাহাত। কিন্তু বাসায় ফিরেই জানতে পারল নীতুও করোনা পজিটিভ হয়ে খুলনা মেডিকেলে ভর্তি রয়েছে। এ ক’দিন কেউ এ কথা রাহাতকে জানায়নি। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হল রাহাতের। সেদিন যদি রাহাত যশোর না যেত! কিংবা দূরত্ব বজায় রাখত! তাহলে এই দুঃসংবাদের মুখোমুখি হয়তো হতে হত না।

পরদিন সকালে রাহাত খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। বোন ও দুলাভাই নিষেধ করলেও রাহাত কারও কথা শোনেনি। তাছাড়া রাহাতের আপুও রাহাতকে খুব জোরালোভাবে আটকাল না। সত্যিটা এই যে, রাহাতের বিদেশ থাকাকালীন পাঁচটা বছর রাহাতের সমস্ত খবর নীতু এই বোনের থেকেই জানত। ফেসবুকে বন্ধুতালিকায় ছিল দু’জন। কলেজজীবনে রাহাতকে নীতু পছন্দ করত কিংবা রাহাত যে নীতুকে পছন্দ করত আপু সেটা জানতেন। তাছাড়া রাহাত-নীতুর বিয়ের বিষয়টিও আপু ও নীতুর মাধ্যমেই পারিবারিক রূপ নেয়। নীতু যে রাহাতের কারণে করোনাক্রান্ত সেটাও আপুর আঁচ করতে অসুবিধা হয় না।

রাহাত যেহেতু করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সদ্য সুস্থ হয়েছে তাই এই ভাইরাস ও রোগীর সাবধানতা বিষয়ে ও অবগত। রাহাতের আগ্রহ ও ভালোবাসার কারণে সব শর্তকে শিথিল করে নীতুর সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করার জন্য পেশাগত দক্ষতা না থাকলেও রাহাতকে পাশে থাকার অনুমতি দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

নীতুর শ্বাসকষ্টের সামান্য সমস্যা আগেই ছিল ফলে এর প্রভাব পড়ে প্রথমেই ফুসফুসে। মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হওয়ার ফলে অক্সিজেনের মাস্ক পরিয়েও শ্বাসকষ্ট কমানো যাচ্ছে না কোনোভাবেই। শরীরে ইমিউনিটি পাওয়ারও কমে যাচ্ছে ক্রমে। ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করা জরুরি কিন্তু খুলনা মেডিকেলে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর নেই। আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স হলে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা যায় কিন্তু সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিবন্ধকতা ও অসহায়ত্ব ঘিরে ধরেছে সকলকে। চারদিকে হাহাকার।

রাহাতের শরীর করোনা যোদ্ধা হিসেবে অ্যান্টিবডি তৈরি করে নিয়েছে। বিষয়টি মাথায় রেখে খুলনা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ  দেশের প্রথম করোনা রোগীর শরীরে রক্তের প্লাজমা ট্রান্সপ্লান্টের মাধ্যমে নীতুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরির পরীক্ষামূলক চেষ্টা করে। নীতুর জন্য, ওদের ভালোবাসার জন্য সর্বান্তকরণে ডাক্তার, নার্সসহ অন্যরা নীতুর প্রাণরক্ষার্থে শেষ চেষ্টা অব্যাহত রাখে।

করোনার ভয়ানক যন্ত্রণা নীতুকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। একবার পৃথিবীর শ্বাস নেওয়ার সুযোগ যেন একটা নতুন প্রাণের সঞ্চার। আবার শ্বাস ছাড়তে যেন কেড়ে নিচ্ছে সে প্রাণ। এ দৃশ্য সহ্যক্ষমতার বাইরে। খুব প্রিয়জনের মৃত্যুও মাঝেমধ্যে কাছের মানুষদের কামনা করতে হয়। এতেই প্রকৃত মুক্তি!

পরদিন দুপুরে রাহাতের চোখে চোখ রেখে পৃথিবীর শেষ অক্সিজেন গ্রহণ করে নীতু।